২০২০ সালে, লালবাগের একটি ছোট্ট পরিসর থেকে যাত্রা শুরু করে সাকিনা হেলথ সেন্টার।
তখন একের পর এক দুঃখজনক খবর আসছিল আর খৎনা করাতে গিয়ে বাচ্চারা মারা যাচ্ছে। এই খবরগুলো আমাদের মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছিল। শরীরের বাইরের একটা সামান্য অতিরিক্ত চামড়া কাটতে গিয়ে একটা শিশুর জীবন কেন ঝুঁকিতে পড়বে? আর এত সাধারণ একটা প্রক্রিয়ার জন্য কেনই বা শিশুকে পূর্ণ অজ্ঞান করার প্রয়োজন হবে?
এই প্রশ্নগুলো থেকেই জন্ম নেয় একটা সংকল্প আর নিরাপদ, ব্যথামুক্ত (যতটা সম্ভব কমানো যায়), রক্তপাতহীন, সেলাই ও ব্যান্ডেজমুক্ত একটা খৎনা পদ্ধতি তৈরি করার। দীর্ঘ গবেষণা আর প্রস্তুতির পর, আমরা শুরু করি সাকিনা হেলথ সেন্টারের যাত্রা।
শুরুর দিনগুলোতে আমাদের তেমন কেউ চিনতো না আর কোনো প্রচারণাও ছিল না। কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ, গত ৬ বছরে আমরা সফলভাবে সম্পন্ন করেছি ৭,০০০-এর বেশি খৎনা। এর মধ্যে নবজাতক থেকে ৪ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা ৩,৫০০, ৪ থেকে ৭ বছর বয়সী ২,৫০০, আর বাকি ১,০০০-এর বেশি ৭ বছরের ঊর্ধ্বে।
ইসলামী শরীয়াহ ও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান আর দুই দৃষ্টিকোণ থেকেই আমরা খৎনার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় নির্ধারণে সাহায্য করি:
আমরা তিনটি আধুনিক, বিশ্বমানের পদ্ধতিতে খৎনা সম্পন্ন করি:
১. আলিসক্ল্যাম্প পদ্ধতি
আমাদের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পদ্ধতি। প্রথমে স্প্রে ও স্থানীয় ব্যথানাশক ইনজেকশন দেওয়া হয়, এরপর সঠিক মাপের একটি বিশেষ ডিভাইস লিঙ্গের অগ্রভাগে স্থাপন করে অতিরিক্ত চামড়া নিয়ন্ত্রিতভাবে কাটা হয়। পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে সর্বোচ্চ ১৫ মিনিট সময় লাগে। খৎনার পরপরই শিশু প্যান্ট পরতে, হাঁটাচলা করতে ও গোসল করতে পারে আর কোনো বেডরেস্টের প্রয়োজন হয় না। সাধারণত ৩ দিন পর ডিভাইসটি খুলে ফেলা হয়, যা মাত্র ১০ সেকেন্ডের একটা প্রক্রিয়া।
২. জেডএসআর পদ্ধতি
একটি বিশেষ স্ট্যাপলার ডিভাইসের মাধ্যমে একই সাথে চামড়া কাটা ও সিল করা হয়। মাত্র ৫-১০ মিনিটে সম্পন্ন হয় এই পদ্ধতি, রক্তপাত ছাড়াই। সেলাইয়ের প্রয়োজন না থাকায় দাগ থাকে না বললেই চলে, আর রিকভারিও অনেক দ্রুত — মাত্র ১-২ দিনেই শিশু স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরে যেতে পারে।
৩. স্ট্যাপলার (অ্যানাস্টোম্যাট) পদ্ধতি
বিশেষ করে বড়দের জন্য উপযোগী এই পদ্ধতিতে স্ট্যাপলার যন্ত্রের সাহায্যে দ্রুত ও নিরাপদে অগ্রচর্ম কাটা ও সিল করা হয়। সময় লাগে ১৫-২০ মিনিট, রক্তপাতহীন এবং প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় দ্রুত সেরে ওঠে।
(প্রতিটি পদ্ধতিই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন করা হয়, যাতে নিরাপত্তা ও মান নিশ্চিত থাকে।)
আমরা মনে করি না যে আমরা শুধু খৎনা করাচ্ছি। আমরা চেষ্টা করছি একটা শিশুর জীবনের এই মুহূর্তটাকে সুন্দর, স্মরণীয় আর ভয়হীন করে তুলতে। প্রথাগত খৎনার সাথে জড়িয়ে থাকা যে ট্রমা ও ভীতি, সেখান থেকে শিশুদের মুক্তি দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য — আর তাই আমরা একসাথে কাজ করি পরিবেশ, আচরণ ও আধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে।
শিশুর আনন্দকেও আমরা গুরুত্ব দিই — খৎনা পরবর্তী সময়ে থাকে উপহারের ব্যবস্থা। বিভিন্ন আয়োজনের মাধ্যমে আমরা দিয়ে থাকি স্টাডি স্কলারশিপ, পরিবারসহ ট্যুর প্যাকেজ, আর শারীরিক সক্রিয়তা বাড়াতে সাইকেলও উপহার দিই। শহুরে যান্ত্রিক জীবনের বাইরে গিয়ে একটা সুস্থ, প্রাণবন্ত জীবনযাত্রার বার্তা পৌঁছে দেওয়াই আমাদের উদ্দেশ্য।
আমাদের লোগোতে পাতার উপস্থিতিও নিছক ডিজাইন নয় — এটি প্রকৃতির সাথে সুস্থ জীবনযাপনের একটি বার্তা, যা আমরা আমাদের প্রতিটি সেন্টারেও ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করি।
শুধু সক্ষম পরিবারদের জন্য নয়, প্রয়োজনের সময় আমরা পাশে দাঁড়াই সবার জন্য:
আজ, ৬ বছর পেরিয়ে, সাকিনা হেলথ সেন্টার হয়ে উঠেছে বাংলাদেশে খৎনা সেবার একটি বিশ্বস্ত নাম। কোনো বড় প্রচারণা ছাড়াই, শুধুমাত্র মানুষের মুখে মুখে ছড়ানো বিশ্বাস আর সন্তুষ্টি থেকেই আমরা পৌঁছে গেছি হাজারো পরিবারের কাছে।
আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল একটা প্রশ্ন থেকে — কেন একটা সাধারণ প্রক্রিয়ায় শিশুরা ঝুঁকিতে পড়বে? আর আজও আমরা এগিয়ে চলেছি একই বিশ্বাস নিয়ে — প্রতিটি সন্তানের জন্য সেরা, নিরাপদ ও আন্তরিক সেবাই প্রাপ্য।
Sakina Health Center is proudly powered by WordPress